রবিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩


জাগরণ

আমরা অপেক্ষা করছি

তারিখ: ১১-০২-২০১৩ (প্র/আ)

শুক্রবারের মহাসমাবেশের লাখো মানুষের বুকে জননী জাহানারাকে জাগ্রত দেখেছি। জনসমুদ্রের ঢেউ মুজিবের ভাষায় বলে উঠেছে, ‘আর দাবায়ে রাখবার পারবা না।’ অপশক্তির বিরুদ্ধে ভাসানীর জলদ কণ্ঠের হুংকার শুনেছি, ‘খবরদার, খামোশ!’। ‘তুই রাজাকার’ স্লোগানে কথা বলতে দেখেছি হুমায়ূন আহমেদকে। ইতিহাস জাগ্রত ছিল, সোনার বাংলা গানের তরঙ্গে বাঁধা ছিল বাংলাদেশ।
১.
তিনজন বৃদ্ধ রাস্তার মাঝখানে নীরব আসনে বসে আছেন। তাঁদের চারপাশ দিয়ে স্রোতের মতো মানুষের ঢল। মাঝের জনের অবিচলিত হাতের কাগজে বড় করে লেখা ‘অপেক্ষা’। দুই পাশের লুঙ্গি পরা দুজনের হাতে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি। হাতে পতাকা। বিকেলের সোনালি রোদ একজনের সফেদ দাড়িতে অপার্থিব আলো ছিটাচ্ছিল। প্রতিটা মহৎ জাগরণ এ রকম অলৌকিক মুহূর্তের জন্ম দেয়, কোনো কোনো দৃশ্য হয়ে ওঠে সেই জাগরণের আত্মা। তিন বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা বহু দূর থেকে এসে মঞ্চ খোঁজেননি, রাস্তার মালিকানা নিয়ে বসে গেছেন। তাঁদের কথা বলতে দেখিনি, একবারের জন্যও উঠে যেতে দেখিনি। তাঁদের বোবা অপেক্ষার জেদ আর প্রতিবাদের কাছে আমরা সেদিন নত হতে পেরেছিলাম। ৪২ বছরের অবিচারের পর তিন লুঙ্গি পরা মুক্তিযোদ্ধার বোবা ‘অপেক্ষা’য় আবেদন ছিল না, ছিল নতুন একাত্তরের চরমপত্র।
শাহবাগ এখন অপেক্ষা করছে জবাবের। উত্তরণের মঞ্চ তৈরি করে জানতে চাইছে, হে দেশ ও দশের মুরব্বি মহাজন, আমাদের অপেক্ষার জবাব কই? আমরা একাত্তরের সাড়ে সাত কোটি প্রাণ তারুণ্যের বেশে জন্মেছি আবার। সংখ্যায় আমরা জনগণের অর্ধেক, সমর্থনে আমরাই গরিষ্ঠ। বলো, কী জবাব দেবে তোমরা? ‘স্বাধীনতার প্রথম প্রহরেই একাত্তরের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সাড়ে সাত কোটি বুকচেরা প্রতিবাদ বোবা হয়ে গিয়েছিল হতাশায়। গত নির্বাচনের পর আমরা অনেকেই ভেবেছিলাম সেই গল্পগুলো মুখ খুলতে পারবে এবার। প্রতিজন শহীদের পরিবার তাদের স্বজনের প্রতিটি ঘাতক-দালালের নাম উচ্চারণের অভয় পাবে। কে কাকে কীভাবে হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতন করেছিল, সেই ইতিহাস নথিবদ্ধ হবে। সম্ভব সর্বোচ্চ জনমত গঠন করে সুষ্ঠুভাবে সব যুদ্ধাপরাধীকে অভিযুক্ত করা হবে। নাটের গুরুদের সবার উচিত শাস্তি নিশ্চিত হবে। ট্রুথ কমিশন গঠন করা হবে। আদালতের বিচারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাজ নতুন ঐক্য গড়বে। ভেবেছিলাম, আদি পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে মুক্তিকামী বাংলাদেশের পুনর্জাগরণ হবে।’ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে উদ্দেশ করে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ফেসবুকে লিখেছিলাম, ‘দয়া করে সিধা হোন।’
কফিল আহমেদও গানে ডেকে যাচ্ছিলেন, ‘বুক টান বুক টান করে দাঁড়াও’। অরূপ রাহী গেয়েছিলেন, ‘মরার দেশে ভাল লাগে না’। কারণ, আমরা দেখছিলাম, ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করা হচ্ছে। রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লাগাতার নাশকতা চালাচ্ছেন জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। গৃহযুদ্ধের হুমকি দিচ্ছেন জামায়াতের নেতারা। সরকারের মধ্যে স্পষ্টতার অভাব। সর্বশেষ কাদের মোল্লার রায় দেখে জনগণের বিরাট অংশ হতবাক হলো। অমলআকাশগান বাঁধলেন, ‘বিচার নিয়েখেলা চলে সোনার বাংলায়’।
তরুণদের সম্পর্কে সবার সব অনুমান ভুল প্রমাণ করে যা অবশ্যম্ভাবীছিলতাই ঘটল। হতাশা মুহূর্তে ক্রোধে পরিণত হলো, ক্রোধ পরিণত হলো আপসহীনতার জেদে, জেদের সংগ্রাম রাজপথে প্রতিবাদের অহিংস উৎসব জাগাল। সাংবাদিক অরুণ বসুর ভাষায়, ‘বাংলাদেশের দামামা শুনে আমি থরথর কাঁপছি আবেগে।’ ৪২ বছরের বিচার বঞ্চনা তুষের আগুন হয়ে ধিকিধিকি জ্বলেছে। ওই তিন মুক্তিযোদ্ধার বোবা প্রতিবাদের মধ্যে সেই তুষের ধিকিধিকি প্রজ্বালনই দেখতে পাওয়া আমরা এখন বুক টান টান হয়ে দাঁড়ানো একাত্তরের সাড়ে সাত কোটি প্রাণের বাংলাদেশ। শাহবাগের এই সত্য যে উপেক্ষা করবে, সে বাতিল হয়ে যাবে। একাত্তরের নয় মাসের কী মূল্য, তা ঠিক হবে সরকারের বাকি নয় মাসে।

২.
যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, আজও যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে এসেছে মানুষ। দল নেই তাদের, নেতা নেই তাদের, ক্ষমতার বাসনা নেই তাদের; তাই তারা দলে দলে এসেছে, নিজেরাই হয়েছে নিজেদের নেতা, হয়ে উঠেছে গণক্ষমতা। অবিচারের বাংলাদেশে তারা বয়ে এনেছে সেই বিচারের বাণী, যা জল্লাদের পায়ের কাছে বারবার লাঞ্ছিত হয়েছে। কিন্তু দিন বদলে গেছে আজ। শাহবাগ আমাদের ‘আশা পুনর্দখলের’ সংগ্রামের নাম, এই সংগ্রামে জননী জাহানারা আমাদের ইমাম। শাহবাগ দলীয় কোটর থেকে একাত্তরকে মুক্ত করার দিন। ৪২ বছর পর জয়বাংলাকে স্বাধীন করার দিন। দলীয় বারান্দার টব থেকে মুক্তিযুদ্ধের মহাবৃক্ষকে আবার বাংলার মাটিতে রোপণ করার দিন। একাত্তর বাংলার ইতিহাসের ফিনিক্স পাখি। এক প্রজন্ম বাড়তে সময় নেয় ২০ বছর। প্রতি ২০ বছরে প্রতিটি নতুন প্রজন্মের হূদয়ে একাত্তরের পুনরুজ্জীবন ঘটে। ৫২ থেকে ৭১, ৭১ থেকে ৯১-৯৩, ৯৩ থেকে ২০১৩ এই সত্যের প্রমাণ। প্রতিটি উত্থানের পর কায়েমি রাজনীতিকে নড়েচড়ে বসতে হয়েছে। কিন্তু এবারের পর রাজনীতি আর আগের মতো থাকবে না। শাহবাগ-উত্থান রাজনীতির মাঠের সবার সব চাল আর ষড়যন্ত্র ভেস্তে দিয়েছে। ভাষা আন্দোলন জন্ম দিয়েছিল নতুন রাজনীতি ও নেতৃত্ব, শাহবাগ আন্দোলনের পর নতুন রাজনীতি এখন অক্সিজেনের মতোই প্রয়োজন। প্রচলিত ধরনের দল বা কর্মসূচি অচল, দুনিয়াব্যাপী সামাজিক জাগরণ তার প্রমাণ। জনগণকে বাদ দিয়েরাজনীতির কোনো খেলাই আর চলবে না। সুশীল সমাজ নয় জনসমাজ। নেতা ও শিক্ষকদের সেই শিক্ষাটাই বোঝাতে চাইছে তরুণেরা।
গণজাগরণ সবচেয়ে পেছনের মানুষদের যেমন সামনের কাতারে নিয়ে আসে, তেমনি সুবিধাবাদী, ষড়যন্ত্রকারী ফেউ-ফ্যাকসারাও সরের মতো ভেসে ওঠে। এদের চিনে নেওয়ার এখনই সময়। ক্ষমতার পায়ায় বাঁধা আর বিত্তবিলাসের সুরায় নিমজ্জিত সাবেকি এলিটরা একে গ্রাস করতে চাইবে। এসব সর আর কচুরি সরিয়েই জনসমুদ্রে সাঁতরাতে হবে সময়ের আগুয়ান তরুণদের। তরুণের সাহস, শপথ আর রক্ত ছাড়া ইতিহাসের দেবতা তুষ্ট হন না, ইতিহাস এগোয় না। তাই যে যেখানে যেভাবে জমায়েত আছেন, স্থায়ী কাঠামো দাঁড় করান, নেটওয়ার্ক পাতুন পরস্পরের মধ্যে। নজরদারি জারি রাখুন। সবাই যেমন সবার শক্তি, সৃষ্টিশীলতা নিয়ে বিপ্লবের শত ফুল ফোটাচ্ছেন, তেমনি আপনি যতটা আপসহীন, সজ্ঞান আর সবল থাকবেন, জাগরণ ততটাই অটুট থাকবে। কারও লড়াই অন্য কেউ করে দেবে না।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পরিচয়ের নোঙর, রাজনৈতিক শুদ্ধির ক্ষার, শাহবাগ তার নবায়নের ময়দান। ফারজানা ববির ভাষায়, শাহবাগ অপরাধ-বেইমানির কাঠগড়ার নাম। কবি ইমরুল হাসান লিখেছেন, শাহবাগ মুক্তিযুদ্ধের ‘প্রকৃত’ অর্থ ‘পুনরাবিষ্কার’ করার ভেতর আছে। কবি শহীদুল ইসলাম রিপন লিখেছেন, জয় বাংলারে বাঁচানো গেছে দলের হাত থেকে। শিক্ষক নাসরিন খন্দকার লিখেছেন, শাহবাগ আমাদের হারানো আশা পুনর্দখলের দিন।
ক্যাম্পাসে আর শাহবাগে বছরের পর বছর প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় ‘দলীয়’ পল্টনের বাইরে জনমানুষের ‘শাহবাগ’ তৈরি হচ্ছিল। অনলাইনে আর ফেসবুকে ব্লগার আর কর্মীরা চালিয়েছেন নিরলস তর্ক ও প্রচার। এই শাহবাগের নির্মাণ তরুণের জেদে আর প্রতিরোধে। শাহবাগ আর স্থান নয়, আপসহীনতার সর্বনাম। একে চোখের মণির মতো রক্ষা করুন। পাশাপাশি অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটনের তোলা প্রশ্নটাও ভাবতে হবে, ‘শাহবাগ-সমাবেশকে ঠিক করতে হবে: কী সে চায় আসলে? এর ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ’।
অহিংস আন্দোলনে অতীতের গাদ ধুয়ে যাক, হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতন আর অবিচারের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শাহবাগ জেগে থাক।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
farukwasif@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন