মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

প্রজন্ম জাগরণ

নির্ঘুম অপেক্ষায় শাহবাগ

গভীর রাতেও প্রতিবাদ-স্লোগানে জেগে থাকে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর।
গভীর রাতেও প্রতিবাদ-স্লোগানে জেগে থাকে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর।
ছবি: ফাইল ছবি
অচেনা পাখির ডাকও একসময় থেমে যায়। ব্যস্ত শহর ঘুমিয়ে পড়ে। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর ঘুমহীন অতন্দ্রপ্রহরী।
এ দৃশ্য কেবল এক দিনের নয়। ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শাহবাগ নির্ঘুম। দাবি পূরণ হওয়ার আগ পর্যন্ত শাহবাগ ঘুমাবে না বলেই শপথ নিয়েছেন সেখানকার প্রতিবাদীরা।
সোমবার। রাত গভীর। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর দিন-রাতের ব্যবধান জানে না, জানে প্রতিবাদ। রাত যত গড়ায়, প্রতিবাদী কণ্ঠ তত জোরালো হয়। ক্লান্তি আর ঘুমকে ছুটি দিয়ে বজ্র কণ্ঠে স্লোগান ওঠে, ‘বুকের ভেতর জ্বলছে আগুন, সারা বাংলায় ছড়িয়ে দাও’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, শাহবাগের মোহনা’, ‘একাত্তরে রেসকোর্স’, ‘তেরোতে শাহবাগ’, ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই’। শাহবাগের এই স্লোগানে রাতের নীরবতা ভাঙে। স্লোগানের তেজ ইথারে ছড়িয়ে পড়ে।

মধ্যরাতের পর শাহবাগের জনস্রোত কমতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে স্লোগানমুখর মানুষ ঘরমুখো হয়। তবে উত্তাল শাহবাগ শান্ত হয় না, হয় না জনশূন্য। রাতভর অনেকেই থেকে যান শাহবাগে। নতুন করে সেখানে আসেন অনেকেই।
সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে এক দম্পতি আসেন প্রজন্ম চত্বরে। সঙ্গে তাঁদের ছয় মাসের শিশু। সংহতি জানাতে গিয়ে তাঁরা বললেন, ‘দেশের প্রশ্নে আপস নয়। তাই এ শিশুও আজ প্রতিবাদে শামিল।’
ওই রাতে আরও অনেককেই তাঁদের শিশুসন্তান নিয়ে শাহবাগের প্রতিবাদে অংশ নিতে দেখা গেছে। শিশু, তরুণ-তরুণী, মধ্যবয়সী এবং বয়সের ভারে নুয়ে পড়া নারী-পুরুষের চোখে নেই কোনো ঘুম বা ক্লান্তি। রাতজাগা এই মানুষগুলোর এক দাবি—‘ফাঁসি’, ফাঁসি’, ‘ফাঁসি’।
ভোর চারটার দিকে এক তরুণ শাহবাগে এসে বললেন, প্রতিবাদে অংশ নিতে সুদূর কানাডা থেকে ঢাকায় এসেছেন তিনি।
বগুড়া থেকে আসা এক মুক্তিযোদ্ধার আকুতি, ‘তোমরা থেমে যেয়ো না। এ মুক্তিযুদ্ধে তোমাদের জিততেই হবে। রাজাকারের ফাঁসি না নিয়ে এ চত্বর ছাড়বে না।’
শাহবাগের পূবালী ব্যাংকের সামনে ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত। রাজাকারদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখার জন্য সেখানে জড়ো হয়ে সারা রাত বসে ছিলেন একদল প্রতিবাদী।
একটু দূরেই প্রস্তুত রাখা হয়েছে কফিন। ফাঁসির পর রাজাকারদের লাশ সেখানে আসার অপেক্ষায় সারাক্ষণ বসেছিলেন আরেক দল প্রতিবাদী।
শাহবাগের বিভিন্ন অংশে রাতভর খণ্ড খণ্ড মিছিল হয়েছে। কেউ মুক্তিযুদ্ধের ছবি দেখে নিজের দেশপ্রেমকে আরও শাণিত করেছেন। কেউবা শাহবাগ চত্বরে বিরামহীনভাবে উড়িয়েছেন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা।
ভোর হতে দেখি ক্লান্তিহীন প্রতিবাদে তখনো শাহবাগ মুখর। মূল মঞ্চে রনি নামের এক তরুণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্লোগান দিয়ে যাচ্ছেন। জড়ো হয়ে থাকা অন্য প্রতিবাদীরা স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত করছেন শাহবাগ। এর মধ্যে প্রতিবাদ চত্বরে বাদ্য নিয়ে হাজির একদল শিল্পী। শেষ প্রহরে শাহবাগে সমস্বরে উচ্চারিত হয়, ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে, আমরা কজন নবীন মাঝি হাল ধরেছি, শক্ত করে রে...’।
পুব আকাশে সূর্য উঠি উঠি। অন্ধকার কেটে ছড়াচ্ছে আলো। জাতীয় সংগীত দিয়ে শুরু হয় নতুন দিন। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আরেকটি নতুন ভোরের অপেক্ষায় নির্ঘুম শাহবাগ। সাইফুল সামিন | প্র/আ.তারিখ: ১৩-০২-২০১৩ rzrz

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন